STORY BEHIND THE SONG.
গানের পিছনের গল্প।
" এক সাগর রক্তের বিনিময়ে "
শিল্পীঃ স্বপ্না রায় (মূল গান)
সুরকারঃ আপেল মাহমুদ
গীতিকারঃ গোবিন্দ হালদার
" এক সাগর রক্তের বিনিময়ে "
শিল্পীঃ স্বপ্না রায় (১ম সংস্করণ)
" এক সাগর রক্তের বিনিময়ে "
শিল্পীঃ স্বপ্না রায় (২য় সংস্করণ)
ছায়াছবিঃ ওরা এগারো জন (১৯৭২)
১৯৭১ সাল। বাংলাদেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে। দেশ ছেড়ে লাখো মানুষ জীবন বাঁচাতে ছুটে আসছে কলকাতায়। আকাশবাণী রেডিও আর খবরের কাগজের মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে পাকবাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের কথা। তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে এসে দাঁড়ান কলকাতার সর্বস্তরের মানুষ। কলকাতার কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা কলম ধরেন মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে।
সেই একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ডাকে সাড়া দেন কলকাতার এক গীতিকবি। তখন তাঁর বয়স ৪১ বছর। নাম গোবিন্দ হালদার। তিনি আয়কর দপ্তরের একজন কর্মী। কাজের ফাঁকে লেখেন কবিতা আর গান। তাঁর গান আকাশবাণীতে নিয়মিত প্রচার করা হতো। তাঁর এক বন্ধুর অনুরোধে তিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখে ফেলেন বেশ কিছু গান। তাঁর গানগুলো এক এক করে প্রচার করা হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। তাঁর গানে আরও উজ্জীবিত হন মুক্তিযোদ্ধারা।
গোবিন্দ হালদারের লেখা সেই অবিস্মরণীয় গানগুলো হলো−
১) ”মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে”,
২) “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে”,
৩) “পূর্ব দিগন্তে সুর্য উঠেছে”,
৪) “লেফট রাইট লেফট রাইট”,
৫) “হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার”,
৬) “পদ্মা মেঘনা যমুনা”,
৭) “চল বীর সৈনিক”,
“হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার বাংলার মাটি” প্রভৃতি।
অতীত হাতড়িয়ে গীতিকার গোবিন্দ হালদার বললেন,
“আমার এক বন্ধু ছিলেন। নাম কামাল আহমেদ। কমার্শিয়াল আর্টিস্ট। থাকতেন কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকার ঝাউতলা রোডে। কামালের স্ত্রী ঢাকা বেতারের উর্দু বিভাগে কাজ করতেন। এখন তাঁরা থাকেন কানাডার মন্ট্রিয়ল শহরে।
যা-ই হোক, একদিন কামাল আমাকে বললেন,
“তুমি তো ভালো গান লেখ। এবার তুমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর কিছু গান লেখো। আমি তা স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচারের ব্যবস্থা করে দেব।”
আমি তখন আয়কর বিভাগে কর্মরত থাকার মধ্যেই আকাশবাণীর তালিকাভুক্ত গীতিকার হিসেবে নিয়মিত গান লিখতাম। কামালের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে শুরু করি গান লেখা। একটি লাইনটানা খাতায় একের পর এক লিখে ফেলি ১৫টি গান।”
একটু বিরতি নিয়ে আবার শুরু করেন তিনি,
“কামাল আমার গানের কলি দেখে দারুণ খুশি। আমাকে নিয়ে গেলেন স্বাধীন বাংলা বেতারের অন্যতম কর্ণধার কামাল লোহানীর কাছে। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর তাঁর হাতে তুলে দেন ওই গানের খাতাটি। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর সম্ভবত ২৩ কিংবা ২৪ ডিসেম্বর ভেসে আসে সেই অবিস্নরণীয় গানটি, “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা” গানটি। তখন কী যে আনন্দ আমার! গানটির সুর দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত সুরকার ও শিল্পী আপেল মাহমুদ।”
গোবিন্দ হালদার এ গানের কথা বলতে গিয়ে বললেন,
“আপেল মাহমুদ তখন শিয়ালদহ স্টেশনের পূরবী সিনেমার পাশে মহাত্মা গান্ধী রোডের শ্রীনিকেতন বোর্ডিংয়ে থাকতেন। এখন অবশ্য ওই বোর্ডিংয়ের নাম বদলে গেছে। আপেল মাহমুদ সে সময় আমাদের বাসায় নিয়মিত আসতেন। মনে আছে, আমি ২১ ডিসেম্বরের দিকে আপেল মাহমুদের সেই বোর্ডিংয়ে যাই। তখন তিনি গানটি আমাকে গেয়ে শোনান। দারুণ লেগেছিল। আমার যতটুকু মনে পড়ে, একাত্তরের ২৩ কিংবা ২৪ ডিসেম্বর গানটি প্রথম প্রচারিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতারে। গানটির লিডিং ভয়েস ছিল স্বপ্না রায়ের। আর কন্ঠ দিয়েছিলেন আপেল মাহমুদ ও সহশিল্পীরা। এখন স্বপ্না রায় কোথায় আছেন জানি না। স্বপ্না রায়ের বাড়ি ছিল ঠাকুরপাড়া, কুমিল্লায়। তখন স্বপ্না রায়ের বয়স ছিল ২১-২২ বছর। মুক্তিযুদ্ধের সময় মা-বাবাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতেই ছিলেন স্বপ্না রায়। পাশের রুমে বসে গানের রেওয়াজ করতেন।”
গানটিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গানের সুরকার আপেল মাহমুদ বলেন,
“এটার সুর করতে গিয়ে আমি লক্ষ শহীদের কথা ভেবেছি। যেহেতু এই গানটি শহীদদের স্মরণে, আমাকে খেয়াল রাখতে হলো, মেলোডির যেন কোনো কমতি না হয়, সুরের যেন বৈচিত্র থাকে। সুরের যেন একটা অ্যাট্রাকশন থাকে, একটা ম্যাগনেটিক পাওয়ার থাকে।”
গোবিন্দ হালদার ১৯৩০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁয়ে জন্মগ্রহণ করেন। চাকরি সূত্রে প্রায় ৫০ বছর আগে কলকাতায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। তিনি একজন গীতিকার ও কবি। তাঁর রচিত প্রথম কবিতা ছিল ‘আর কতদিন’। তিনি প্রায় সাড়ে তিন হাজার কবিতা ও গান লিখেছেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দূর দিগন্ত’। বাংলাদেশপ্রেমী এই মহান গীতিকার দীর্ঘ দিন ধরে কিডনি সমস্যায় ভোগার পর ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি কোলকাতায় মৃত্যুবরন করেন।
২০০৬ সালের মার্চ মাস জুড়ে বিবিসি বাংলার শ্রোতারা তাঁদের বিচারে সেরা যে পাঁচটি গান মনোনয়ন করেছেন, তার ভিত্তিতে বিবিসি বাংলা তৈরি করেছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকা। এর মধ্যে “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা’’ গানটি ২০ সেরা গানের মধ্যে ৫ম অবস্থানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
গানের কথাঃ
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে,
বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা
আমরা তোমাদের ভুলবনা। দু
:সহ বেদনার কন্টক পথ বেয়ে
শোষণের নাগপাশ ছিঁড়লে যারা
আমরা তোমাদের ভূলব না।।
যুগের এ নিষ্ঠুর বন্ধন হতে
মুক্তির এ বারতা আনলে যারা
আমরা তোমাদের ভুলব না।।
কিষাণ কিষাণীর গানে গানে,
পদ্মা, মেঘনার কলতানে,
বাউলের একতারাতে আনন্দ ঝঙ্কারে
তোমাদের নাম ঝংকৃত হবে।
নতুন স্বদেশ গড়ার পথে
তোমরা চিরদিন দিশারী রবে
আমরা তোমাদের ভুলব না।।


Comments
Post a Comment