STORY BEHIND THE SONG.
গানের পিছনের গল্প।

" জয় বাংলা বাংলার জয় "


শিল্পীঃ শাহনাজ বেগম ও আবদুল জব্বার সহ সমবেত কণ্ঠে
সুরকারঃ আনোয়ার পারভেজ
গীতিকারঃ গাজী মাজহারুল আনোয়ার

"জয় বাংলা বাংলার জয়"


'জয় বাংলা বাংলার জয়
হবে হবে হবে হবে নিশ্চয়
কোটিপ্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে
নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়...’

এ গানটি শোনেনি এমন কোন বাঙালি নেই। এই গানটির মধ্য দিয়ে মুক্তির সংগ্রামে উদ্দীপ্ত হয়ে হানাদার বধে এগিয়ে যায় বাংলার ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকসহ সবশ্রেণীর জনতা। এই গানটি বাংলার মুক্তিপিপাসু মানুষের চেতনায় মুক্তির আগুন ধরায়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-নির্বিশেষে এই গানটিকে আরাধ্য করেই মুক্তির পথে এগিয়ে যায় সমগ্র বাঙালি জাতি। গানটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার উৎস। যার কারণে "জয় বাংলা, বাংলার জয়" গানটিকেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রণসংগীত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার

এই গান সম্পর্কে গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন,

“১৯৭০ সালের দিকে লেখা হয় এই গানটি, তবে ঠিক তারিখ মনে নেই। তখন সময়টা ছিল উত্তাল, সবার প্রাণে একটাই চাওয়া—জয়। চোখের সামনে লাখো কোটি মানুষের একটাই চাওয়া, সেটি স্বাধীনতা। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর আহ্বান, যার কাছে যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়। আমাদের হাতে কলম ছিল, আমরা কলম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। যার কাছে সুর ছিল, সে গান নিয়ে এসেছে। জহির রায়হান ক্যামেরা নিয়ে কাজে নেমেছেন। আসলে সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল এই স্বাধীনতা। তখন আসলে গানটি লিখতে হয়নি, এমনিতেই আমার কলম দিয়ে গানের কথা বেরিয়ে গেছে। ওই সময়ে প্রত্যেকটা মানুষের মনের কথাগুলো শুধু এক হয়ে একটি গান হয়ে গেছে।"


তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির বঞ্চনা-দুর্দশা আর স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষাকে গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার আশ্চর্য ছন্দময় কুশলতায় বাণীবদ্ধ করেছিলেন। অনন্যসাধারণ মেধা ও প্রজ্ঞায় নিপুণ দক্ষতায় গানটিতে সুর সংযোজন করেছিলেন আনোয়ার পারভেজ। মার্চের রিদমে রক্তে শিহরণ লাগানো, অনুরণন জাগানো অসম্ভব স্পার্কিং এই গানটি ছিল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রাণের আকুতি। আশ্চর্য এক সম্মোহনী শক্তি রয়েছে এই গানটির সুর সংযোজনায়। যন্ত্রানুষঙ্গের অপরূপ বিন্যাস গানটিতে রোপণ করেছে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের অবিনাশী মন্ত্র।

"জয় বাংলা" — মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান, স্বাধীনতার স্লোগান। ১৯৭১ সালের সবচেয়ে উদ্দীপক স্লোগান। প্রকৃত অর্থে এ স্লোগান ছিল মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার সমার্থক শব্দ। "জয় বাংলা" স্লোগানটির আবির্ভাব ১৯৬৯ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মুখে সর্বপ্রথম উচ্চারিত এ শব্দটি। যদিও এর আগে ১৯৬২ সালে ‘জয় বাংলা’ শিরোনামে ছাত্রদের হাতে লেখা একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ’৭০-এর জানুয়ারিতে এ স্লোগানটি মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। তবে স্লোগানটি জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত রূপ পায়, যখন চলচ্চিত্রের গান হিসেবে এটি ব্যবহার করা হয়। ১৯৭০ সালে ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আবুল খায়ের ‘জয় বাংলা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়াস নেন, যার পটভূমি হবে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফার ওপর ভিত্তি করে। সে মোতাবেক চিত্র পরিচালক ফখরুল আলম চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য তৈরি করেন এবং ছবির গান লেখার দায়িত্ব দেন গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে। এ সময় অন্য গানগুলোর সঙ্গে গীতিকার "জয় বাংলা, বাংলার জয়" এই গানটি লেখেন।

অক্টোবর ১৯৭০-এর মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। তখন অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে সমগ্র দেশ একটি তীব্র সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ২৬ বছরের তরুণ আনোয়ার পারভেজ এই সময়েই কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বেশ প্রশংসা অর্জন করেন। চিত্র পরিচালক ফখরুল আলম তাঁকে তার চলচ্চিত্র 'জয় বাংলা' এর জন্য সুর করতে বলেছিলেন। ফখরুল আলম বলেছিলেন সুর এমন হতে হবে যেন সেই সময়ে দেশটিকে আবেগের যে ঝড় আচ্ছাদিত করে রেখেছিল তা সঠিকভাবে প্রতিধ্বনিত হয়।

সুরকার আনোয়ার পারভেজ


সুরকার আনোয়ার পারভেজ তার অমূল্য এই দেশের গান প্রসঙ্গে বলেন,

“আমি যখন গুনগুন করে গাইছিলাম, গাজী মাজহারুল আনোয়ার তখন গানের কথা দ্রুত লিখে যাচ্ছিলেন। আমরা শেরে বাংলা নগরের সংসদ ভবনের ঠিক পাশেই একটি বাসায় বসে গানটি সৃষ্টিতে ব্যাস্ত ছিলাম। ঐ সময়ে আমরা বাসার কাছাকাছি কোথাও মিলিটারিদের বুটের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। সম্ভাব্য গ্রেপ্তার এড়ানোর লক্ষ্যে ভয়ংকর বুটের আওয়াজ দূরে সরে যাওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম। প্রতিটি সেকেন্ডকে তখন এক একটি ঘণ্টা মনে হচ্ছিল। কিন্তু আমাদের উত্তেজনাই আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিল গানটি পরবর্তী আধা ঘন্টার মধ্যে শেষ করতে পারায়। পরে যা কিনা একটি অমূল্য গান হয়ে যায়। কোনও বিশেষ দলের জন্য গানটি রচনা করা হয়নি। এটি এমন এক সময়ে রচনা করা হয়েছিল যখন জনগণ স্বাধীনতা লাভের একটি ইস্যুতে একই ছাতার নিচে একতাবদ্ধ হয়েছিল।

যখন একজন সুরকার একটি গানের সুর করতে বসেন, তখন তাকে তার প্রাথমিক সহজাত ধারণা নিয়ে এবং "তৃতীয় নয়ন"-এর উপর নির্ভর করে এগিয়ে যেতে হয়। তার সৃষ্টিতে কল্পনাশক্তি শুধুমাত্র গানের বিষয়বস্তুর উপর ফোকাস না করে ভবিষ্যতে শ্রোতাদের উপর গানটি কি পরিমাণ প্রভাব ফেলতে পারে সেটিও বিবেচনায় আনতে হয়। তাই, যখন আমাকে নির্দিষ্ট একটি চলচ্চিত্রের গানে সুর দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল, তখন প্রথমেই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা দেশের অর্ধভুক্ত, অর্ধনগ্ন জীর্ণশীর্ণ মানুষগুলোর মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল, যারা কিনা জীবনধারণের সমস্ত আশা হারিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু স্বাধীনতার আশা ঠিকই বুকে পুষে রেখেছিল। আমি এমন একটি সুর তৈরি করতে চেয়েছিলাম যা, সেই আশাটায় পুনরায় একটি আলোর শিখা জ্বালিয়ে দিতে পারবে। আমি আমার আবেগকে চেপে রাখতে পারিনি যখন আমি গানটির কথায় ধাপে ধাপে সুর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কণ্ঠশিল্পীরাও অত্যন্ত উদ্দীপ্ত ছিল। আব্দুল জব্বার, আমার বোন শাহনাজ রহমতউল্লাহ সহ আরও কয়েকজন শিল্পী গানটিতে কন্ঠ দিয়েছিলেন।

ইন্দিরা রোডের “ইন্টারন্যাশনাল রেকর্ডিং স্টুডিও”তে গানটি মনো রেকর্ডিং সিস্টেমে শীতের রাতে হাল্কা ঠাণ্ডার মধ্যে রেকর্ড করা হয়েছিল। রেকর্ডিঙের চরম কারিগরি সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চীফ রেকর্ডিষ্ট আব্দুল মজিদ জাদু দেখিয়েছিলেন। “জয় বাংলা, বাংলার জয়” গানটি একটি সাধারণ ধারণা থেকে টেপ রোলসে বাস্তবায়ন করতে আমাদের এক ঘণ্টারও কম সময় লেগেছিল। আমরা স্টুডিও থেকে যখন বেরিয়ে আসি তখন প্রায় ভোর হয়ে গিয়েছিল। স্টুডিও থেকে বেরিয়ে আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখি অপেক্ষমান জনগণের একটি বিশাল গ্রুপ চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছে। কিন্তু সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের ভয়ে আমরা দ্রুত ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লাম। এবং আমাদের ভয় অমূলক ছিল না, সেই সময় দেশের চলমান পরিস্থিতির জন্য চলচ্চিত্রের নামটি পর্যন্ত সাময়িকভাবে পরিবর্তন করে “সংঘাত” রাখা হয়েছিল। 
তবে সব বাধা সত্ত্বেও, আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল যখন উপলব্ধি করি লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা, যারা সম্ভবত থেঁতলান এবং রক্তাক্ত অবস্থায় পরিখার ভিতর শুয়ে সেই গানটি শুনেছিল। এমনকি যদি একটি মুহূর্তের জন্যও গানটি আশা এবং অনুপ্রেরণা যুগিয়ে থাকে তাদের, সেটাই হবে আমার জন্য সারাজীবনের একটি অর্জন। 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস ধরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে'র সূচনা এবং সমাপনী গান (সিগনেচার টিউন) হিসেবে “জয় বাংলা, বাংলার জয়” গানটি ব্যবহার করা হয়।“


পরের ঘটনাটি সহজেই আন্দাজ করা যায়। তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক সরকারের পক্ষে "জয় বাংলা" নামে কোনো চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অনুমতি প্রদান করার ভাবনা কল্পনাতীত। যদিও জনরোষের মুখে সে সময় জহির রায়হানের "জীবন থেকে নেয়া" চলচ্চিত্রটি মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তান সরকার। প্রযোজক আবুল খায়ের অবশ্য চলচ্চিত্র মুক্তি দেয়ার কোনো চেষ্টাই বাদ রাখেননি। পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তা রাও ফরমান আলী'কে চলচ্চিত্রটি দেখানো হলেও কোনো আশার আলো দেখেনি তা। অবশেষে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ২৬ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছিল চলচ্চিত্রটি। মুক্তির আগেই চলচ্চিত্রটির গান ও সংলাপ রেকর্ডে প্রকাশ করা হয়। এ রেকর্ডের মাধ্যমেই ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি জনপ্রিয় হয়।


গানের কথাঃ

“জয় বাংলা বাংলার জয়
জয় বাংলা বাংলার জয়
জয় বাংলা বাংলার জয়
হবে হবে হবে হবে নিশ্চয়
কোটিপ্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে
নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়
জয় বাংলা বাংলার জয়
জয় বাংলা বাংলার জয়।

বাংলার প্রতিঘর ভরে দিতে চাই মোরা অন্নে
আমাদের রক্ত টগবগ দুলছে মুক্তির দীপ্ত তারুণ্যে
নেই ভয়
হয় হোক রক্তের প্রচ্ছদপট
তবু করি না করি না করি না ভয়
জয় বাংলা বাংলার জয়
জয় বাংলা বাংলার জয়।

অশথের ছায়ে যেন রাখালের বাঁশরি হয়ে গেছে একেবারে স্তব্ধ
চারিদিকে শুনি আজ নিদারুণ হাহাকার আর ওই কান্নার শব্দ
শাসনের নামে চলে শোষণের সুকঠিন যন্ত্র
বজ্রের হুংকারে শৃঙ্খল ভাঙতে সংগ্রামী জনতা অতন্দ্র
আর নয়
তিলে তিলে বাঙালির এই পরাজয়
আমি করি না করি না করি না ভয়
জয় বাংলা বাংলার জয়
জয় বাংলা বাংলার জয়।

ভুখা আর বেকারের মিছিলটা যেন ওই দিন দিন শুধু বেড়ে যাচ্ছে
রোদে পুড়ে জলে ভিজে অসহায় হয়ে আজ ফুটপাতে তারা ঠাঁই পাচ্ছে
বার বার ঘুঘু এসে খেয়ে যেতে দেবো নাকো আর ধান
বাংলার দুশমন তোষামোদী-চাটুকার সাবধান সাবধান সাবধান
এই দিন
সৃষ্টির উল্লাসে হবে রঙিন
আর মানি না মানি না কোনও সংশয়
জয় বাংলা বাংলার জয়
জয় বাংলা বাংলার জয়
হবে হবে হবে হবে নিশ্চয়
কোটিপ্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে
নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়
জয় বাংলা বাংলার জয়
জয় বাংলা বাংলার জয়।”

Comments

Popular posts from this blog