STORY BEHIND THE SONG.
গানের পিছনের গল্প।
" ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায় "
জাগরণের গান
শিল্পীঃ আব্দুল লতিফ
সুরকারঃ আব্দুল লতিফ
গীতিকারঃ আব্দুল লতিফ
" ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায় "
ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়।
কইতো যাহা আমার দাদায়,
কইছে তাহা আমার বাবায়,
এখন কও দেখি ভাই,
মোর মুখে কি অন্য কথা শোভা পায়।
১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠনের পর থেকেই এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী। এ অঞ্চলের মানুষের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো কখনো তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। বাংলাকে পাশ কাটিয়ে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অপপ্রয়াস চালায়। সেই ’৪৭ সাল থেকেই এ দুরভিসন্ধি নিয়ে এগোচ্ছিল। নিজের সংস্কৃতির প্রতি অনুরক্ত পূর্ব পাকিস্তানিরা গোড়াতেই তা ধরে ফেলে। গড়ে তোলে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে থাকে সর্বত্র। এই গানটির রচয়িতা ও সুরকার আব্দুল লতিফ। ভাষা আন্দোলনের সরব সংগ্রামী ছিলেন শিল্পী-গীতিকার আবদুল লতিফ। ভাষা আন্দোলনই তার লেখনীকে ক্ষুরধার করে তুলল, তার কণ্ঠকে করে তুলল উদাত্ত। মুখের ভাষা কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠলেন। ভার্সেটাইল জিনিয়াস জ্বালাময়ী ভাষায় লিখলেন সেই গান যে গান শুনে জনগণের শিরা-উপশিরায় রক্ত টগবগিয়ে উঠেছিল। প্রথমবারের মতো গ্রামীণ চাষাভুষার ভাষায় দেশজ জারির সুরে এই গান যেন হৃদয়ের কথা বলে। সুরের দেশপ্রেমের গান এটি। মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে না দেওয়ার প্রতিজ্ঞা ফুটে উঠেছে এই গানে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলার আপামর জনসাধারণের অংশগ্রহণ এবং রক্তত্যাগের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয় অর্জন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রেরণা দেয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে। সেই সাথে শিল্পীদের সঙ্গীতও আন্দোলন হয়ে বিপ্লব আনে মুক্তিযুদ্ধে। বলা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সঙ্গীত মানুষকে উজ্জীবিত করে ব্যাপকভাবে। সামাজিক, রাজনৈতিক যে কোনো আন্দোলনে একটি দেশের জনগণের সঙ্গে সঙ্গীতের গভীর সম্পর্ক তাই অনেক গুরুত্ব বহন করে।
‘ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়
ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে পায়।’
এমন গান শুনলে মাতৃভাষাকে রক্ষায় কে আর স্থির থাকতে পারে? ভাষা থেকে সঙ্গীত, সঙ্গীত থেকে অনুপ্রেরণা আর অনুপ্রেরণা থেকে ত্যাগ আর ত্যাগ থেকে বিজয়।
শিল্পী আব্দুল লতিফ ছিলেন একজন অসাধারণ মানুষ। মাঝে মাঝে উনি উপলব্ধি করতেন যে, কে যেন ওনাকে জোরে চেপে ধরত। তখনই ওনাকে কাগজ কলম নিয়ে বসে যেতে হত এবং যা কিছু মনে আসত তা লিখে ফেলতেন। এর পরে উনি আবার ওনার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতেন। তার মানে এই যে উনি অনুভব করতেন যে, কে যেন তাকে দিয়ে তার গানগুলো লিখতে বাধ্য করতো। ওনার গানের কথাগুলো যেন কোনো অদৃশ্য উত্স থেকে আসত। ওনার বিখ্যাত 'সোনা , সোনা , সোনা, লোকে বলে সোনা' গানটি লেখা, সুর দেওয়া এবং গাওয়া শেষ হয়েছিল একই বসায় ৩০ মিনিটের ভেতর। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানে তিনিই প্রথম সুর দিয়েছিলেন। কয়েক বছর তার সুরেই গানটি গাওয়া হয়েছিল। পরে শহীদ আলতাফ মাহমুদ গানটির নতুন সুর দেন। এখন আলতাফ মাহমুদের সুরে গানটিই গাওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যেসব গান লিখেছিলেন তার মধ্যে ‘আমার দেশের মতো, এমন দেশ কি কোথাও আছে’ গানটি তো খুবই জনপ্রিয়। এর শিল্পী ছিলেন আব্দুল আলীম।
আব্দুল লতিফ-এর বলা গল্প থেকে জানা যাক গানের পিছনের গল্প।
"কৈশোরে স্কুল জীবনের সীমানা অতিক্রম করতে না করতেই কলকাতা চলে যাই। ১৯৪৮ সালের দিকে উপোস করে দিন কেটেছে। সে কী কষ্টরে বাবা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতায় এয়ার ওয়ার ইনফরমেশন সেন্টারে তিনি কর্মজীবন শুরু করি। চাকরি যাওয়ার পর তাঁবু সেলাইয়ের কাজ করে দিন কাটালাম। মনের ভেতর সুর আওড়াই আর সেলাই করি পেট বাঁচাতে। গানটাকে তবু বাদ দেই নি। সেখান ওস্তাদদের কাছে তালিম নেই সংগীতে, শিল্পী হিসেবে পরিচিত লাভ করি। এরপর চলে আসি ঢাকায়। এখানেই তিনি স্থায়ী হই। ১৯৪৮ ফিরে এসে বেতারে অডিশন দিয়ে নিয়মিত সঙ্গীত পরিবেশন করতে লাগলাম।
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসে ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে থাকে সর্বত্র। কেননা ভাষা হলো যে কোন জাতির মূল সংস্কৃতি। ফলে সেই আঘাতকে কাটিয়ে গানকে অস্ত্র করতেই গণসঙ্গীতটা অন্যতম হাতিয়ার হলো। পরিকল্পিত কোন কিছু না। কিন্তু নিজের বিবেক থেকেই ঐ যে বাংলা ভাষা বলা যাবে না, সেই বাঁধা থেকেই উঠে এলো গণসঙ্গীত। সেই সময়ই এই বিখ্যাত গানটি লিখে ফেললাম। গানটি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশন করি। ঐ সময়ে গানটি অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছিল। এরপরের ইতিহাস তো সবারই জানা। আজ সেটি ভাষার গান হিসেবে কালজয়ী এক সঙ্গীত।
১৯৫৩ সাল। আমার বাসা তখন ঢাকার কমলাপুরে। ঘরের বাইরে বাথরুম। একদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটা-ছ’টা হবে। বাথরুমে যাব বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছি। আচমকা ‘ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়’ এই লাইনটি আমার মনে এসে গেল। আমার মনে হলো, এই মোক্ষম লাইনটির জন্যেই যেন আমি অপেক্ষা করছিলাম। ঘরে এসে তখনি খাতা-কলম নিয়ে বসে গেলাম বিছানায়। এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে গানটি লেখা হয়ে গেল। সুর ছাড়া গানটির প্রথম শ্রোতা আমার স্ত্রী। কিন্তু গানটি গান হয়ে উঠল কি না, সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্যে একজন কবিকে দেখানো প্রয়োজন বলে আমার মনে হলো। গানটি নিয়ে যাই একজন বিখ্যাত কবির কাছে। তাঁর নাম আমি বলতে চাই না। গানটি পড়ে তিনি আমাকে বললেন,
‘এটা গান হয়নি। বালিশের তলায় রেখে দাও, দুদিন পরে তুমিই ছিঁড়ে ফেলে দেবে।’
এই কথা আমার স্ত্রী শুনে বলল,
'এটা তুমি ফররুখ (কবি ফররুখ আহমদ) ভাইকে দেখাও।'
স্ত্রীর কথামতো ফররুখ ভাইয়ের বাসায় ছুটে যাই। গানটি পড়ে শোনাই তাঁকে। আমার গান পড়া শেষ হলে ফররুখ ভাই আমাকে তাঁর বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
‘তুই এ কী করেছিস? এ গান তো তোকে অমর করে রাখবে।’
আমি ফররুখ ভাইয়ের উচ্ছ্বাস দেখে অবাক। সেই বলার ভেতরে যে দৃপ্ততা ছিল, তা শুনে ওর চোখে মুখে যে আনন্দ দেখেছিলাম, তা সত্যিই দেখার মতো। ফররুখ ভাই কবি আহসান হাবীবকে চিঠি লিখে দিলেন, ‘এই গানটি তুমি পারলে ছাপিয়ে দিও।’ কবি আহসান হাবীব তখন দৈনিক আজাদের সাহিত্য সম্পাদক। তিনি গানটি দেখে আমাকে বললেন,
‘ভালো হয়েছে। কিন্তু আমি কাজ করি মুসলিম লীগের কাগজে। এখানে তো এই লেখা ছাপা হবে না।’
পরে শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর সেজো ভাই এহতেশাম হায়দার চৌধুরী গানটি ছাপার ব্যবস্থা করেন। তত্কালীন মুসলিম লীগ নেতা আলী আমজাদ খানের সাপ্তাহিক কাগজে আমার এ গান ছাপা হয়।"
১৯৩৫ সালের ৭ মার্চ বরিশালের রায়পাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী, ভাষা সৈনিক ও গীতিকার আব্দুল লতিফ। স্বকীয় অবদানের জন্য তিনি একের পর এক জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। একুশের পদক, স্বাধীনতা, পদক, বাংলা একাডেমি পদক, শিল্পকলা একাডেমি পদক। ১৯৫২ সালের ২৮ ডিসেম্বর পটুয়া কামরুল হাসানের বোন মিস নাজমাকে বিয়ে করেন। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০০৫।

Comments
Post a Comment