STORY BEHIND THE SONG.
গানের পিছনের গল্প।
"কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু"
সুরকারঃ বাউল শাহ্ আব্দুল করিম
গীতিকারঃ বাউল শাহ্ আব্দুল করিম
সংগীতায়োজনঃ হাবিব ওয়াহিদ
১) কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু / শাহেদ ইকবাল
২) কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু / হাবিব ওয়াহিদ
৩) কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু / সায়েরা রেজা
৪) কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু / সাইদা তানি
৫) কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু / বাঁশি / ইফতেখারুল আনাম
হাওরবেষ্টিত ভাটি বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম ‘উজান ধল’। সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার এই গ্রামে ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন মরমী সাধক বাউল শাহ্ আব্দুল করিম। আর মৃত্যু বরণ করেন ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। গানে গানে পিরিতি তিনি এতোটাই বাড়িয়ে গেলেন যে, তার অনুপস্থিতি আজও আমাদের ভারাক্রান্ত করে।
বাউল শাহ্ আব্দুল করিম
যে হাওরের নিলুয়া বাতাস তাকে করে তুলেছিল বাউল, সেই বাতাসকে আলিঙ্গন করে নিজ বসত বাড়ির উঠানে চিরনিদ্রায় শুয়ে রয়েছেন মরমী সাধক বাউল শাহ্ আব্দুল করিম। পাশেই শুয়ে আছেন প্রিয়তমা স্ত্রী সরলা বিবি। যিনি নিজেও সাধক ছিলেন। তাঁর পত্মীপ্রেম ছিল অন্তহীন। সে কথার প্রমাণ আছে তাঁরই রচিত গানে, ‘সরল তুমি নাম তোমার সরলা।’ অকালে দেহত্যাগী পত্মীর কথা মনে হলে তিনি দিব্যমান হয়ে উঠতেন, আর পরক্ষণেই বিরহ-বেদনায় অশ্রু ফেলতেন এবং বলতেন, "তাঁর (স্ত্রী) বাবা-মায়ে নাম রাখছিল আফতাবুন্নেসা। আমি আদর করে নাম রাখছি সরলা।… সে যদিও লেখাপড়া জানত না। তবু এমন একটা মানুষ আছিল, তারে ধইরা রাখতে পারলাম না।"
নিজের স্ত্রী সরলার স্মৃতিচারণে তিনি গান বেঁধেছিলেন,
নিজের স্ত্রী সরলার স্মৃতিচারণে তিনি গান বেঁধেছিলেন,
“কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি”
সংগীতায়োজক হাবিব ওয়াহিদ
সংগীতায়োজক হাবিব ওয়াহিদ গানটি নিয়ে বলছেন তার কথা।
১৯৯৯ সালের নভেম্বর কি ডিসেম্বর মাসের কথা। আমি তখন যুক্তরাজ্যে। তখনই প্রথম ‘কেমনে ভুলিব আমি বাঁচি না তারে ছাড়া’ শুনি, হেলালের কণ্ঠে। প্রথম শোনাতেই গানটি মনে ধরে যায়। অন্য রকম একটা মায়া জন্মায় গানটির প্রতি। কী কথা, কী সুর! তখনো শাহ আবদুল করিম সম্পর্কে জানতাম না। এ গানটি দিয়েই তাঁকে চিনতে শুরু করি, তাঁর সম্পর্কে জানতে শুরু করি। এরপর তাঁর গান আরো শুনতে থাকি। যতই শুনি ততই মুগ্ধ হই। একসময় মনে হলো নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর গানকে উপস্থাপন করা গেলে মন্দ হবে না। এ জন্য আধুনিক সংগীতায়োজনের ওপর জোর দিই। সব মিলিয়ে শাহ আবদুল করিমের গোটা দশেক গান নিয়ে কাজ করেছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গানটি ছিল ‘কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু’।
গানের কথা
কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি
কেমনে রাখিব তর মন,
আমার আপন ঘরে বাঁধি রে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি।
ছেড়ে যাইবা যদি
কেমনে রাখিব তর মন,
আমার আপন ঘরে বাঁধি রে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি।
পাড়া-পড়শি বাদী আমার
বাদী কালনী নদী
মরম-জ্বালা সইতে না'রি,
দিবা-নিশি কান্দি রে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি।
বাদী কালনী নদী
মরম-জ্বালা সইতে না'রি,
দিবা-নিশি কান্দি রে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি।
কারে কি বলিব আমি
নিজে অপরাধী
কেঁদে-কেঁদে চোখের জলে
বহাইলাম নদী রে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি।
নিজে অপরাধী
কেঁদে-কেঁদে চোখের জলে
বহাইলাম নদী রে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি।
পাগল আব্দুল করিম বলে
হল এ-কী ব্যাধি?
তুমি বিনে এ ভুবনে
কে আছে ঔষধি রে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি।
হল এ-কী ব্যাধি?
তুমি বিনে এ ভুবনে
কে আছে ঔষধি রে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি।
কালনী নদী, কৃতজ্ঞতাঃ তপন রায়
‘উজান ধল’ গ্রাম-এর চারদিকে শুধু পানি আর পানি। পানির মধ্যে দূরে বহুদূরে ছিটেফোঁটার মতো দু’চারটি গ্রাম। হওরাঞ্চলে বছরের অর্ধেক সময় কোনো কাজ থাকে না। দারিদ্র্য সেখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। ছোটবেলা থেকেই সেই দারিদ্র্য সঙ্গী করে আব্দুল করিমের বেড়ে ওঠা। পেটের দায়ে কৃষি কাজে শ্রম দিয়েছেন অন্যের জমিতে। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কালনী নদী। হাওর আর কালনীর ঢেউ এবং হেমন্তে হাওরের বুকে সবুজ ফসলের দোলা তাকে উদাসী করে তোলে। কখনও হাতছাড়া করেননি প্রিয় একতারা; জীবদ্দশায় এটি ছিল নিত্যসঙ্গী।
জীবনের শুরু থেকেই আব্দুল করিম ভাবনা ও আবেগ গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে চাইতেন। এটিই ছিল তার প্রথম ভালোলাগা। সেই ভালোলাগার স্রোত ওই কালনীর ঢেউয়ের মতোই তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। এরপর পরিচয় শাহ ইব্রাহীম মাস্তান বক্সের সঙ্গে। এই আধ্যাত্মিক বাউল সাধকের নিকট তিনি দীক্ষা নেন। এ ছাড়াও তিনি সান্নিধ্য লাভ করেন ওস্তাদ করম উদ্দীন ও রশিদ উদ্দীনের। এরা দুজনই বাউল সাধক।
বাউল শাহ্ আব্দুল করিম রচিত গানের ছয়টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে (কালনীর ঢেউ, ধলমেলা, আফতাব সঙ্গীত, গণসঙ্গীত, কালনীর কোলে ও ভাটির চিঠি)। সিলেট শিল্পকলা একাডেমির কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান ছিলেন করিমের একান্ত ভক্ত। তিনিই তার লেখা গানের খাতা পৌঁছে দেন বাংলা একাডেমির শামসুজ্জামান খানের কাছে। মূলত এই হান্নানই বাউল করিমকে আবিষ্কার করে তুলে আনেন আজকের এই বৃহৎ পরিমণ্ডলে। ২০০১ সালে দেশের সর্বোচ্চ খেতাব "একুশে পদক" প্রাপ্তির পরই আব্দুল করিম প্রচারে আসেন। তখন তার বয়স নব্বই ছুঁইছুঁই।
ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ, প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তার গান কথা বলে সকল অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তিনি যখন গান গাইতেন তখন তা ধর্মীয় বিধি নিষেধের পরিপন্থী বলে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়। প্রচলিত এই সমাজ আব্দুল করিমকে একাধিকবার বিতাড়িত করেছে, সমাজচ্যুত করেছে। রাতব্যাপী ওয়াজ মাহফিলের নামে গালিগালাজ করে তাকে কাফের, মুরতাদ বলে তার বিরুদ্ধে অপব্যাখ্যা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঈদের নামাজের খুতবাতেও তার বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। অথচ বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ সেই সমাজের লোকেরাই গর্ব করে বলে, বাউল শাহ্ আব্দুল করিম এই হাওরের সন্তান, আমাদের গ্রামের সন্তান।
আব্দুল করিম অসংখ্য গান লিখে গেছেন। এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার গান এখন পর্যন্ত সংগ্রহ করা গেছে। বর্তমানে অনেক শিল্পীকে বিভিন্নভাবে মূল সুরের বিকৃতি ঘটিয়ে করিমের গান গাইতে দেখা যায়। এক সময় অতিষ্ঠ হয়ে কাছেন মানুষদের তিনি বলেছেন, ‘আমি যেহেতু গানের স্বরলিপি প্রণয়ন করে যেতে পারলাম না, তাই সুরের খানিকটা এদিক সেদিক হলে আপত্তি নেই কিন্তু মূল গীত যেন ঠিক রাখা হয়।’
বর্তমানে তাঁর রচিত ও সুরাপিত গান বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত পরিমণ্ডল ছাড়িয়ে উঠে এসেছে চলচ্চিত্রে, হাল আমলের জনপ্রিয় সঙ্গীতধারা ব্যাণ্ডসঙ্গীত শিল্পীদের কণ্ঠে, ইউরোপ থেকে সঙ্গীতশাস্ত্রে দীক্ষিত শিল্পীদের কণ্ঠে এবং দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে তা গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে ভারতে এবং যুক্তরাজ্যের বাঙালি সমাজে।



Comments
Post a Comment