STORY BEHIND THE SONG.
গানের পিছনের গল্প।
“ সালাম সালাম হাজার সালাম ”
শিল্পীঃ মোহাম্মদ আবদুল জব্বার
সুরকারঃ মোহাম্মদ আবদুল জব্বার
গীতিকারঃ ফজল-এ-খোদা
“ সালাম সালাম হাজার সালাম ”
গানটির শিল্পী মোহাম্মদ আবদুল জব্বার-এর জবানীতে শুনুন গান সৃষ্টির পিছনের গল্প।
"১৯৬৯ সাল। গণঅভ্যুত্থানের হাওয়ায় উত্তাল দেশ। এমনই প্রেক্ষাপটে কবিতা লেখার মানসে কবি ফজল-এ-খোদা হাতে কলম তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু কবিতার পরিবর্তে গানের কথা বেরিয়ে আসবে, তা হয়তো তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। একদিন হঠাৎ করেই তিনি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। হাতে তুলে দিলেন অনবদ্য গীতিকথার টুকরো কাগজটি। টুকরো কাগজে লেখা কথাগুলো পড়েই শিহরিত হয়ে উঠলাম। মনে হলো, এটা তো আমারই কথা! মনের গহিনে সারাক্ষণ এ কথাগুলোই বেজে চলে! অথচ কখনও বলা হয়নি। এবার যখন বলার সুযোগ এলো, সে সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলাম না।
দিনরাত ভাবতে থাকলাম কেমন হবে গানের সুর? কারণ গানটির সুর না করা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। এক সময় সুর করেও ফেললাম। অনেক ভেবে চিন্তেও যে সুর খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তা হঠাৎ করেই চলে আসে মাথায়। কীভাবে কীভাবে যেন পুরো গানটারই সুর করে ফেলি। এরপর মনে হলো যে ভার বুকে চেপে ছিল তা থেকে মুক্তি মিলল। সুরটাও গানের সঙ্গে মাননসই বলে মনে হয়েছিল আমার। কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই, গানটি সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো পরিবেশ পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রায় দুই বছর পর এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। সেটি ছিল ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে উজ্জীবিত হয়ে উঠলাম। ভাষণের পর চলল 'সালাম সালাম হাজার সালাম' গানটি গাইতে গাইতে ট্রাকে করে ঘুরে বেড়ানো। এই গানের কথা একদিন বঙ্গবন্ধুর কানেও পেঁৗছেছিল। তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, তোর মতো এত পাতলাপুতলা একটা পোলা আইয়ুবের বিরুদ্ধে কথা কয়, ভয় করে না? তখন আমি তাকে বলেছিলাম, বাবা আপনে যদি ভয় না পান, তাহলে আমি পাব কেন? আমার মুখে এমন কথা শুনে সেদিন থেকে বঙ্গবন্ধু আমাকে ছেলে সম্বোধন করা শুরু করেছিলেন। তারপরও অনুমান করতে পারিনি, এই গানটি পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী গান হয়ে উঠবে।"
সময় টেলিভিশনে এই গানের ওপর এক অনুষ্ঠানে ফজল-এ-খোদা বলেছিলেন, ‘আমি বশিরের জন্যই গানটি লিখেছিলাম।’ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘সংগীতভাবনা’ নামে প্রবন্ধের বইতে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ শিরোনামের লেখা থেকে জানা যায়, ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো যায় - এরকম একটি গানের কাঠামো এবং সুর নিয়ে বশির আহমেদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। তিনি গানটি লেখার পর বশির আহমেদকে দিয়েছিলেন কিন্তু তখন তা রেকর্ড করেননি। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে মোহাম্মদ আবদুল জব্বার নিজের সুরে গানটি রেকর্ড করেন।
গানটির গীতিকার ফজল-এ-খোদা -এর জবানীতে শুনুন গান সৃষ্টির পিছনের গল্প।
"১৯৬৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে গানটি লিখেছিলাম। তখন দেশের মানুষ স্বাধিকারের জন্য প্রাণ দিচ্ছে। বিক্ষুব্ধ সময় পার করছিলাম আমরা। আমি একদিন শিল্পী বশির আহমদকে বললাম, ভাষা শহীদদের জন্য গান লেখা হয়েছে। কিন্তু এখন যারা পাকিস্তানের অন্যায়-জুলুমের প্রতিবাদ করতে গিয়ে শহীদ হচ্ছে সেসব অগণিত শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটি গান লিখলে কেমন হয়? আমরা শহীদদের সালাম জানাতে পারি, পাশাপাশি সেই গানে তুলে ধরতে পারি আমাদের অব্যাহত সংগ্রামের কথা। বশির আহমদ সোৎসাহে সম্মত হতেই বাসায় ফিরে রাতেই গানটি লিখে ফেলি। ফেরার পথে রিকশায় আমার মনের মধ্যে হঠাৎ একটি বাণী গুনগুনিয়ে ওঠে- 'সালাম সালাম হাজার সালাম সকল শহীদ স্মরণে।' আমি একটা ঘোরের মধ্যে আওড়াতে থাকলাম- 'সালাম সালাম…। যতই আওড়াই ততই ভালো লাগে।
তবে গানটি কিন্তু প্রচারিত হয় অনেক পরে। সে আরেক ঘটনা। একদিন শিল্পী আবদুল জব্বার বললেন, 'বঙ্গবন্ধু বলেছেন, এখন থেকে বেতার-টিভিতে বাংলায় গান হতে হবে- এমন গান, যে গান শুনে মানুষ শহীদ হওয়ার জন্য প্রাণ বাজি রাখবে এবং সেই গান তোমাকেই লিখতে হবে। আমি তখন তাকে ‘সালাম সালাম’ গানটির কথা বললাম। সে গানের লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়ে আমাকে নিয়ে আবদুল জব্বার চলল বঙ্গবন্ধুর কাছে। বঙ্গবন্ধু রেডিওতে গানটি প্রচারের অনুমতি দিলেন। কিন্তু গোল বাধালেন তৎকালীন রেডিওর সংগীত বিভাগের প্রধান নাজমুল আলম। তার আপত্তি গানের মধ্যে ‘বাংলাদেশের লাখো বাঙালি, জয়ের নেশায় চলে রক্ত ঢালি’ নিয়ে। বাঙালিদের রক্ত ঢালার কথা বলা যাবে না। কারণ পাকিস্তান আর্মি-পুলিশ তো দুষ্কৃতকারীদের শায়েস্তা করছে। তারা সাধারণ মানুষকে তো মারছে না।
জব্বার তো তার অদ্ভুত এই যুক্তি শুনে রেগে গেলেন। আমরা ছুটলাম ঢাকা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক আশরাফ-উজ-জামান খানের কাছে। তিনি সব শুনে বললেন, একটি কথার জন্য এই গানের প্রচার বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হবে না। ‘রক্ত ঢালি’ শব্দটি বদলে দিলেই হবে। আমি ‘চলে রক্ত ঢালি’ বদলে ‘আনে ফুলের ডালি’ লিখে দিলাম। ১৪ মার্চ গানটি রেকর্ডের পর সেদিন থেকেই প্রচারিত হতে থাকল। এরপর তো ইতিহাসই হয়ে গেল।"


Comments
Post a Comment