II বন্দে মাতরম্ II

ভারতের 'জাতীয় স্তোত্র বা রাষ্ট্র গীত' হিসেবে
স্বীকৃতি দেয়ার পিছনের গল্প।


অনুমান করা হয়, ১৮৭৬ সাল নাগাদ ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকুরিরত অবস্থাতেই ‘বন্দে মাতরম্’ কবিতাটি রচনার কথা ভেবেছিলেন বিখ্যাত লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তবে ঠিক কোন সময় তিনি গানটি রচনা করেছিলেন তা জানা যায় না। এটি দূর্গা দেবীর প্রশস্তি সংগীত হিসেবে রচিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে, ওই কবিতাটিকে আরও বড় আকারে লিখে তিনি তাঁর 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে ১৮৮২ সালে অন্তর্ভুক্ত করেন। 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘জনগণমন’ ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হলেও বঙ্কিমচন্দ্র রচিত ‘বন্দে মাতরম্’ কবিতার সম্পূর্ণ ছ’টি স্তবকের ২৬ লাইনের মধ্যে প্রথম দু’টি স্তবকের ১২ লাইনকে জাতীয় স্তোত্র বা রাষ্ট্র গীত-এর স্বীকৃতি দেয়া হয়। ভাল করে পড়লে বোঝা যাবে ‘বন্দে মাতরম্’ কবিতাটিতে সংস্কৃত ও বাংলা, দু’টি ভাষাই ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও পুরো কবিতাটিই বাংলা হরফে লেখা হয়েছিল। তবে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত অংশটুকু সংস্কৃত ভাষায় লেখা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সংগীতের প্রথম চার লাইনকে দূর্গার বন্দনা হিসেবে গ্রহণ না করে দেশ মাতৃকার বন্দনা হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষে মত দেন। বর্তমানে 'জনগণমন' ভারতের জাতীয় সংগীত বা রাষ্ট্র গান ও ‘বন্দে মাতরম্’ ভারতের জাতীয় স্তোত্র বা রাষ্ট্র গীত হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি। নতুন ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানসভার শেষ অধিবেশন। সভার শেষে প্রেসিডেন্ট রাজেন্দ্রপ্রসাদ জানালেন, রবীন্দ্রনাথের ‘জনগণমন’ হবে ভারতের জাতীয় সংগীত বা রাষ্ট্র গান আর স্বাধীনতা সংগ্রামে যে গান লোকের মুখে মুখে ফিরেছে, সেই ‘বন্দে মাতরম্’ও ভারতের জাতীয় স্তোত্র বা রাষ্ট্র গীত হিসেবে পাবে সমান মর্যাদা। উল্লেখ্য বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে কংগ্রেস দল ‘বন্দে মাতরম্’ কে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

যাতে দেশভাগের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্যই দেশের জাতীয় নেতারা একমত হয়ে ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দু’টি স্তবক বেছে নিয়েছিলেন যে কোনও জাতীয় সমাবেশে গাওয়ার জন্য। ওই দু’টি স্তবক বেছে নেওয়ার কারণ, সেখানে সব ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ যেন দেশমাতার বন্দনা গাইতে পারেন। ১৯৩৭ সালের অক্টোবরে কলকাতায় যে এআইসিসি অধিবেশন হয়, সেখানে ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রথম দুই স্তবকই গাওয়া হয়।

সংস্কৃততে- वन्दे मातरम् (‘বন্দে মাতরম্’); কথার অর্থ 'বন্দনা করি মায়ের'। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই গানটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। রচনার অব্যবহিত পরে লেখক বঙ্কিমচন্দ্র বিষ্ণুপুর ঘরানার বাংলা ধ্রুপদ গানের অন্যতম শিল্পী এবং সঙ্গীতজ্ঞ যদুভট্টকে তাঁর কবিতাটিতে সুরারোপ করার জন্য অনুরোধ করেন। ১৮৮২-তে এই কবিতাটিতে যদুভট্ট ‘মল্লার’ (মালহার) রাগে সুর দিয়ে লেখকের ড্রয়িং রুমে গেয়ে শুনিয়েছিলেন। ভাটপাড়ায় বসে তিনি এই সুর তৈরি করেছিলেন। যদুভট্ট যুক্ত ছিলেন আদি ব্রাহ্মসমাজ সঙ্গীত বিদ্যালয়ের সঙ্গেও। সম্ভবত সেই সময়েই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিছু কাল তাঁর কাছে সঙ্গীত শিক্ষা করেন। 
সঙ্গীতজ্ঞ যদুভট্ট
 
কিন্তু রাগ বদলে গেল বছর তিনেক পর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন উঠতি ব্যান্ডগায়কদের মতো। যে লেখা ভাল লাগে, তাতেই সুর বসান। বৈষ্ণব পদাবলীর ‘ভরা ভাদর, মাহ ভাদর’ থেকে বিহারীলাল চক্রবর্তীর ‘বুঝতে নারি নারী কী চায়’ সবেতেই সুর দেন। ‘বন্দে মাতরম্’-এর সুরও এই সময়েই। ১৮৮৪-তে ‘দেশ রাগে’ গানটি বাঁধলেন তখনকার তরুণ কবি ও সুরকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বঙ্কিমচন্দ্রকে শোনালে সুরটি তাঁর পছন্দও হয় ৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুর বসিয়েছিলেন প্রথম দুটি স্তবকে। বাকিটুকু শেষ করলেন তাঁর ভাগ্নি সরলা দেবী। সরলা দেবীকে ঘিরেই ওই ‘বন্দে মাতরম্’ স্লোগানের জন্ম। স্বদেশী আন্দোলনের সময় ময়মনসিংহের ‘সুহৃদ সমিতি’ মিছিল করে সরলাকে নিয়ে গেল বক্তৃতা মঞ্চে। আওয়াজ উঠল ‘বন্দে মাতরম্’। এই প্রথম স্লোগানে ‘বন্দে মাতরম্’!

১৮৮৫ সালে ‘বালক’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই গানের স্বরলিপি প্রকাশ করলেন। বঙ্কিমের মৃত্যুর পর ১৮৯৬ সালে বিডন স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গাওয়া হয় ‘বন্দে মাতরম্’গানটি। গানটি ‘মল্লার’ রাগেই পরিবেশন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাঁচ বছর বাদে ১৯০১ সালের কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে গানটি পরিবেশন করেন দক্ষিণাচরণ সেন। এরপরে কংগ্রেসের বারাণসী অধিবেশনে গানটি পরিবেশন করেছিলেন সরলা দেবী চৌধুরাণী। একাধিকবার এই গানটিতে সুরারোপ করা হয়। সমগ্র বিংশ শতাব্দীতে গানটি প্রায় একশোটি ভিন্ন সুরে রেকর্ড করা হয়েছিল।


‘বন্দে মাতরম্’ কবিতা খুঁজে পাওয়ার গল্পঃ

‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার এক কর্মী ছোট একটি কবিতা খুঁজছিলেন। কারণ কাগজে গল্প ছাপার গ্যালি প্রুফের নীচে খানিকটা ফাঁকা জায়গা রয়ে গিয়েছিল। একটি ছোট কবিতা বা গান পেলেই শূন্য স্থানটি ভরাট করে দেওয়া যায়। সম্পাদক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ড্রয়ার হাতড়ে তখন পাওয়া গেল তাঁর লেখা একটি কবিতা, ‘বন্দে মাতরম্ সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম্।’ কর্মী বঙ্কিমচন্দ্রকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটি ওখানে দিই?’ বঙ্কিমচন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে সেটি ছিনিয়ে নিয়ে বললেন, “ও ভাবে ছাপা যাবে না। এক দিন দেখবে, দেশ এই গানে মেতে উঠেছে। সে দিন আমি থাকব না, কিন্তু তুমি দেখে যেতে পারবে।”

সম্পাদকের ড্রয়ারে পাওয়া কাগজে কবিতাটি অসম্পূর্ণ লেখা ছিল। পরে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে হিন্দু সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ দেখাতে গিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র সেটি বাড়িয়ে দেন। লেখা হয় ‘তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে’ বা ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী’র মতো লাইন। গ্যালি প্রুফের ঘটনাটি জানিয়েছিলেন বঙ্কিমের ছোট ভাই পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার ম্যানেজার ছিলেন, তাঁর চোখের সামনে ঘটনাটি ঘটেছিল।


কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর গানের গলার খ্যাতি ছিল। তখন তো মাইকের ব্যবহার চালু হয়নি। খোলা জায়গায় চড়ায় গাওয়াই চল ছিল। ১৮৯৬ সালে কংগ্রেস অধিবেশনে ‘বন্দেমাতরম’ গাইতে গিয়ে তাঁর গলা ভেঙে যায়, সুকণ্ঠও সেই সঙ্গে তিনি হারিয়ে ফেলেন। এখন যে তাঁর গানের ও আবৃত্তির দীর্ঘবাদন আমরা শুনি, তা তাঁর গলা ভেঙে যাবার পর বৃদ্ধ বয়সের। কণ্ঠস্বর-ধারণ-যন্ত্রও ছিল অনুন্নত মানের। তবু তাঁর গায়ন ও আবৃত্তিশৈলীর আন্দাজ একটা বোধহয় পাই। গলার সুর হারিয়ে যাওয়ায় তাঁর নিজের আক্ষেপ ছিল। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের কথা থেকে এটা জানা যায়।

‘বন্দে মাতরম’ / সঙ্গীতা কাট্টি কুলকার্নি

‘বন্দে মাতরম’ / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


বন্দে মাতরম্ সঙ্গীতের প্রাচীনতম অডিও রেকর্ডিংটি ১৯০৭ সালের। যত দূর জানা যায় ফ্রেডেরিক উইলিয়াম গেইসবার্গ (Frederick William Gaisberg) কর্তৃক রেকর্ডকৃত কংগ্রেস অধিবেশনের সেই রেকর্ডিংটি নষ্ট হয়ে গেছে। এটি আর শোনার সুযোগ নেই। ফ্রেডেরিক উইলিয়াম গেসবার্গ (১ জানুয়ারী ১৮৭৩ – ২ সেপ্টেম্বর ১৯৫১) একজন আমেরিকান সংগীতশিল্পী, রেকর্ডিং প্রকৌশলী এবং 'গ্র্যামোফোন কোম্পানি'-এর প্রাথমিক ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত প্রযোজক ছিলেন। এই 'গ্র্যামোফোন কোম্পানি' ছিল প্রথম রেকর্ডিং কোম্পানিগুলির একটি।


জাতীয় স্তোত্ররূপে গৃহীত অংশঃ

বন্দে মাতরম্
সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম্
শস্যশ্যামলাং মাতরম্॥
শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম্
ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম্
সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম্
সুখদাং বরদাং মাতরম্॥

Comments

Popular posts from this blog