II ঠুমরি II


আমার আজকের ঠুমরি হচ্ছে

"বাবুল মোরা নৈহার ছুটহী যায়"

এই ঠুমরিটি রাগ ভৈরবীতে বাঁধা হয়েছে। এখানে কিছু ভিডিও ক্লিপ আছে। গান শুনতে প্রতিটি গানের সাথে দেওয়া ভিডিও লিংকে ক্লিক করুন।

১) “বাবুল মোরা” / জগজিৎ সিং ও চিত্রা সিং


২) “বাবুল মোরা” / গজল রানী বেগম আখতার


৩) “বাবুল মোরা” (ক্লাসিকাল বন্দিশ) /জগজিৎ সিং


৪) “বাবুল মোরা” / সায়ানি পালিত (X-Raf)


মোগলদের হাত থেকে যেদিন ইংরেজরা ছলেবলে-কৌশলে দিল্লির সিংহাসন দখল করে নিল সেদিনই ভারতবর্ষের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ভুবনে নেমে এসেছিল তমসা। ইংরেজরা বেনিয়ার জাত। তারা বাণিজ্য বোঝে, সংস্কৃতি বোঝে না, সঙ্গীত বোঝে না। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আলাউদ্দিন খিলজির আমলে যে রাগসঙ্গীত আমির খসরু উদ্ভাবন করেছিলেন এবং তিলে তিলে গড়েছিলেন, অনেক যুগ অতিক্রমের পর ইংরেজের হাতে তার নিধন শুরু হলো।

মোগল সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ল। যে দিল্লির রাজদরবারে 'নবরত্ন' সভা এককালে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিল, ইংরেজের নিষ্পেষণে সেই নবরত্নের চিহ্ন রইল না। ফলে দিল্লির সঙ্গীতজ্ঞ ও সঙ্গীতশিল্পীদের ছোট ছোট রাজা ও নওয়াবদের দরবারে আশ্রয় নিতে হলো। এমনকি অনেক নওয়াবকেও ইংরেজরা তাদের রাজ্য থেকে বিতাড়িত করেছিল। তেমনই এক হতভাগ্য ছিলেন নওয়াব ওয়াজেদ আলী শাহ। তিনি ছিলেন অযোধ্যার শেষ নওয়াব। ১৮৪৭ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্য শাসন করেন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে রাজ্য শাসন করেন। ১৮৫৬ সালে ইংরেজরা অযোধ্যা অধিকার করে নেয়। এর পরপরই ইংরেজ শাসক নওয়াব ওয়াজেদ আলী শাহকে কলকাতা শহরতলীর মেটিয়াবুরুজের গার্ডেন রিচে নির্বাসিত করে। লক্ষ্নৌর দরবারের আসর ভেঙে গেলেও নওয়াব সঙ্গীতশিল্পীদের ছাড়েননি। তাদেরও তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। লক্ষ্নৌর নওয়াব ওয়াজিদ আলী শাহের কায়সারবাগ প্রাসাদটি ১৮৪৮ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। তাঁর প্রত্যাশা ছিল এই প্রাসাদটি পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য হিসেবে বিবেচিত হবে। লক্ষ্নৌ ছেড়ে যাওয়ার সময় এই প্রাসাদে বসেই তিনি বিদায়ের বেদনা প্রকাশ করে লিখেছিলেন "বাবুল মোরা" ঠুমরিটি। ঠুমরিতে তার হৃদয়ের আর্তি ফুটে উঠেছিল অত্যন্ত গভীরভাবে। তিনি লিখেছিলেন-

বাবুল মোরা নৈহার ছুটহী যায়
অঙ্গনা তো পর্বত ভয়ো
ঔর দেহরী ভয়ো বিদেশ
লে বাবুল পিয়া কী দেশ
সঙ্গ চলহী জায়
চার কহার মিল ভুলিয়া মঙ্গাবে
অপনা বেগানা ছুটহী জায়।

(আমার প্রাণের দুলালী পিত্রালয় ছেড়ে চলে যাচ্ছে
এই প্রাঙ্গণ পাথরসম
এই দেশ পরদেশের ন্যায় বোধ হচ্ছে
চারজন বেহারা পালকি নিয়ে এসেছে
পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সে পরিত্যাগ করে চলেছে।)


নওয়াব ওয়াজেদ আলী শাহ

রাগসঙ্গীতের শাস্ত্রকার ও ইতিহাসবিদরা ঠুমরি গীতশৈলীর অন্যতম প্রচলকের কৃতিত্ব নওয়াব ওয়াজেদ আলী শাহর ওপরই অর্পণ করেন। ঠুমরি উচ্চাঙ্গসঙ্গীত পর্যায়ের একপ্রকার লঘু প্রকৃতির গান। ঠুমরি গানের সঙ্গে শৃঙ্গাররস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ গানের বাণীতে শৃঙ্গাররসের চিন্তাধারার অভিব্যক্তি পদে পদে প্রস্ফুটিত হয়ে থাকে। প্রেমিকের প্রতি প্রেয়সীর প্রেমনিবেদন, বিরহের রূপবর্ণন, মিলনের আকাঙ্ক্ষা ঠুমরি গানের প্রতিপাদ্য বিষয়। প্রকৃতপক্ষে সঙ্গীতকলাকার গোলাম নবী সৌরি মিঞা খেয়াল থেকে ঠুমরি গানের উদ্ভাবন করেন। পূর্বরাগ, অনুরাগ, মিলন, বিরহ, বিরাগ, বিচ্ছেদ সব বিষয় নিয়ে ঠুমরি রচিত। ঠুমরিতে প্রীতম, পিয়া, সৈঁয়া, বালম, সঁবরিয়া, সজন ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহৃত হয়। নওয়াব ওয়াজেদ আলী শাহ ঠুমরির বড় মাপের একজন পৃষ্ঠপোষক ও সংরক্ষক ছিলেন। তিনি ঠুমরির এক ঘরানা প্রবর্তন করেন। এ ঘরানা 'লক্ষ্নৌ ঘরানা' নামে পরিচিত। এ ঘরানার বৈশিষ্ট্য হলো, খেয়ালের লঘু চালের সঙ্গে 'ভাও' বা অভিনয়ের ভঙ্গিমা সংযোগ করে এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। ঠুমরিতেই তার অবদান সমধিক। তিনি ঠুমরির পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।

উনবিংশ শতাব্দীতে ঠুমরি খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আর ঠুমরির কেন্দ্রভূমি ছিল লক্ষ্নৌ। ওখানকার নওয়াবরা রাজ্য শাসনের চেয়ে গান-বাজনার প্রতি বেশি অনুরক্ত ছিলেন। আর সঙ্গীতের এমনই একজন অনুরাগী শাসক ছিলেন নওয়াব ওয়াজেদ আলী শাহ। সঙ্গীতপ্রেমী নওয়াব হিসেবে তিনি খুবই প্রসিদ্ধ ছিলেন।

ওয়াজেদ আলী শাহ প্রচুর ঠুমরি রচনা করেন। তিনি তার রচনায় 'আখতার পিয়া' বা 'আলী' ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। মেটিয়াবুরুজে নির্বাসিত জীবনযাপনে থাকাকালেও সঙ্গীতকে তিনি পরিত্যাগ করেননি। তিনি সেখানে 'সঙ্গীতসভা' গড়ে তোলেন। 'সঙ্গীতসভা' তৎকালীন বাংলার রাগসঙ্গীত চর্চা ও সাধনাকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছিল। উনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চাঙ্গসঙ্গীত চর্চায় পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ওয়াজেদ আলী শাহ ও তার 'সঙ্গীতসভা' বিপুল অবদান রাখে। ওয়াজেদ আলী শাহর পৃৃষ্ঠপোষকতায় ঠুমরি গান সঙ্গীতভুবনে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। উনবিংশ শতকে রাগসঙ্গীতে অনুরাগে রঞ্জিত ঠুমরি গানের যে ধারা নবাব ওয়াজেদ আলী শাহর পৃষ্ঠপোষকতালাভে পুষ্ট হয়েছিল সে ধারা আজো সঙ্গীতভুবনে অব্যাহত রয়েছে।

Comments